ট্রুম্যান থেকে ট্রাম্প: ইসরাইল লবির চাপে বারবার নতি স্বীকার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্টরা?
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যনীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে একটি গবেষণাভিত্তিক বিশ্লেষণ, যেখানে দাবি করা হয়েছে—১৯৪৮ সালে প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস. ট্রুম্যানের সময় থেকে শুরু করে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পর্যন্ত প্রায় সব মার্কিন প্রেসিডেন্টই কোনো না কোনো পর্যায়ে ইসরাইলপন্থি লবির রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছেন।
লেখকদের মতে, এর ফলে বহু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত জাতীয় স্বার্থের চেয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপই পররাষ্ট্রনীতিকে বেশি প্রভাবিত করেছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনে যুদ্ধ চলাকালে ট্রুম্যান এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হন। একদিকে জায়নবাদী সংগঠন ও দেশীয় রাজনৈতিক উপদেষ্টারা ইহুদি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে জোরালো চাপ দিচ্ছিলেন। অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জর্জ সি. মার্শালসহ শীর্ষ সামরিক ও কূটনৈতিক কর্মকর্তারা সতর্ক করেছিলেন, এমন সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সৃষ্টি করবে এবং আরব ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
মার্শাল বৈঠকে ট্রুম্যানকে সরাসরি সতর্ক করে বলেছিলেন, রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রেসিডেন্টের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করবে। বৈঠকে ট্রুম্যান তার সঙ্গে একমত হলেও মাত্র দুই দিনের মধ্যেই নির্বাচনি বাস্তবতা বিবেচনায় ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেওয়ার নির্দেশ দেন।
লেখকদের মতে, এটিই ছিল এমন এক দৃষ্টান্ত, যা পরবর্তী কয়েক দশকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে বারবার পুনরাবৃত্তি হয়েছে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, ১৯৭০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার মধ্যপ্রাচ্য নীতির পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেন। কিসিঞ্জারের গঠিত ‘ওয়াইজ মেন’ কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে সুপারিশ করেছিল, আরব-ইসরাইল শান্তিচুক্তির স্বার্থে ইসরাইলকে পশ্চিম তীর ও গাজা থেকে সরে যেতে চাপ দেওয়া উচিত।
তবে এই সুপারিশ প্রকাশ্যে আসার পরই আমেরিকান-ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি এবং অন্যান্য ইসরাইলপন্থি সংগঠন ব্যাপক প্রচারণা শুরু করে। ৭৬ জন সিনেটরের স্বাক্ষরিত একটি চিঠির মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ফোর্ডের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি সেই সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করেন এবং ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহায়তা আরও বাড়িয়ে দেন।
একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারও। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির অংশ হিসেবে ‘ফিলিস্তিনি স্বদেশ’ প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নেন। কিন্তু ইসরাইলপন্থি লবির তীব্র বিরোধিতা এবং রাজনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত তার উদ্যোগও সীমিত হয়ে পড়ে। পরে ইসরাইল ও মিসরের মধ্যে পৃথক শান্তিচুক্তি হলেও ফিলিস্তিন প্রশ্নটি মূল আলোচনার বাইরে চলে যায়।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশও দখলকৃত এলাকায় ইসরাইলি বসতি নির্মাণে আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে গিয়ে প্রবল লবিংয়ের মুখে পড়েন। সে সময় তিনি প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন, ক্যাপিটল হিলে তার বিপক্ষে প্রায় এক হাজার লবিস্ট কাজ করছে, অথচ তার পক্ষে মাত্র একজন কর্মকর্তা রয়েছেন।
লেখকদের মতে, বারাক ওবামা ক্ষমতায় এসে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলেও ইসরাইলি বসতি নির্মাণ বন্ধে চাপ অব্যাহত রাখতে পারেননি। ইসরাইল সরকার ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী লবির বিরোধিতার মুখে তিনি শেষ পর্যন্ত নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেন। পরে জাতিসংঘেও তার বক্তব্যে আগের তুলনায় ইসরাইলের প্রতি বেশি সমর্থন দেখা যায়।
জো বাইডেনের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানের সময় তার শীর্ষ উপদেষ্টাদের একাধিক সুপারিশ উপেক্ষা করা হয়। যদিও তিনি বেসামরিক হতাহতের বিষয়ে সীমিত উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন, তবু সামগ্রিকভাবে ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন অব্যাহত থাকে।
গাজায় সংঘটিত গণহত্যার পর যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলকে ঘিরে জনমতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে বলে দাবি করেছেন লেখকরা। তাদের মতে, গাজা, লেবানন ও পশ্চিম তীরে ইসরাইলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে অনেক মার্কিন নাগরিক তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। এর রাজনৈতিক প্রভাবও পড়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ওপর। ২০২০ সালে জো বাইডেনকে ভোট দিলেও ২০২৪ সালে কমলা হ্যারিসকে ভোট না দেওয়া প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভোটার বলেছেন, গাজায় ইসরাইলের সহিংসতা বন্ধ করাই তাদের ভোটের সিদ্ধান্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।
লেখকদের দাবি, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলেই ইসরাইলের প্রতি সমর্থন কমেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন এবং কংগ্রেসের প্রাইমারি নির্বাচনে ইসরাইলের সমালোচক প্রার্থীরা আগের তুলনায় বেশি সফল হচ্ছেন।
তবে জনমতের এই পরিবর্তন সত্ত্বেও ইসরাইলপন্থি লবির প্রভাব কমেনি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। লেখকদের মতে, তারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য-সংক্রান্ত নীতিকে আরও এগিয়ে নিতে সক্রিয় রয়েছে।
একই সঙ্গে তারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলপন্থি লবির মতো অন্যান্য অর্থশক্তিনির্ভর স্বার্থগোষ্ঠীও নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে। তাদের সতর্কবার্তা, যদি ভিন্নমতের মানুষ সব সময় ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ তকমার ভয়ে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে না পারেন, তবে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ভবিষ্যতেও ভারসাম্যহীনই থেকে যাবে।

